মাওলানা জুনাইদ
ঐক্যের প্রয়োজন ও এর প্রভাব সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব আরও বাড়ছে। তবে, কারো সংখ্যাধিক্যের অহমিকা কিংবা সংকীর্ণ মনোভাব, অথবা নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে যাওয়ার ভয়— এই সবকিছু ঐক্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে, কিছু বিষয় নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য এবং একতাবদ্ধ কণ্ঠস্বর অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যা মুসলিমদের জাতীয় স্বার্থে উচ্চারিত হবে।
পুরোপুরি ঐক্য সম্ভব নয়, আর এটি ইসলামের নির্দেশও নয়। এজন্য দরকার এমন একটি জাতীয় পরিষদ গঠন করা, যা কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে পরিচালিত হবে এবং এতে সকল মুসলিম ঘরানার প্রতিনিধিরা থাকবেন। এই পরিষদের মূল লক্ষ্য হবে পারস্পরিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইসলাম ও মুসলিমদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কাজ করা। এতে কারো নিজস্ব চিন্তা বা মতাদর্শের কোনো ক্ষতি হবে না। প্রতিটি ঘরানা তাদের চিন্তাধারা সংরক্ষণ করে, শুধু জাতীয় ও সাধারণ মুসলিম স্বার্থে একত্রিত হবে। এটি এমন একটি ঐক্য হবে যাকে বলা যায় ‘ইত্তিহাদ মাআল ইখতিলাফ’, অর্থাৎ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, যেখানে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও ঐক্য বজায় থাকবে।
এই ধরনের ঐক্যের প্রস্তাবিত কাঠামো:
- পরিষদ শুধুমাত্র সেইসব ইস্যুতে আলোচনা এবং কাজ করবে, যেগুলোর ব্যাপারে সকলের মতের মিল রয়েছে।
- যেকোনো বিষয়ে কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘সবার ঐকমত্য’ হবে প্রধান মানদণ্ড। যেমন, কোনো ইস্যুতে সবাই যদি যৌথ বিবৃতিতে একমত হন, তাহলে কেবল সেই উদ্যোগই গ্রহণ করবে জাতীয় পরিষদ।
- ছোট, বড়, কিংবা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুসলিম দল বা উপদল যেন এই পরিষদের বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
- পরিষদ নিজের মধ্যে কোনো মতপার্থক্যপূর্ণ ইস্যুতে মন্তব্য বা কাজ করবে না।
- পরিষদের কাজের পরিধি, কর্মপন্থা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতিমালা এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে, যাতে কোনো ধরনের সংকট বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়।
- পরিষদের একটি ছোট আহবায়ক কমিটি থাকতে পারে, যা বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হবে, যারা প্রধান প্রধান ঘরানার নেতৃত্বে আছেন। এই কমিটির কাজ হবে জাতীয় ইস্যুতে পরিষদের সভা আহ্বান করা।
- যদি জাতীয় পরিষদে কোনো একক আমীর নির্বাচিত করতে ঐকমত্য না হয়, তবে সিনিয়রদের মধ্যে লটারি বা পালা করে প্রতিটি সভার সভাপতি নির্বাচন করা যেতে পারে।
- আহ্বায়ক কমিটি পরিষদের সদস্যদের মতামত নিয়ে মিডিয়ায় কথা বলার জন্য একজন উপযুক্ত মুখপাত্র নিয়োগ করবে, যিনি মিডিয়ার সামনে পরিষদের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে তুলে ধরবেন। তিনি ছোট ঘরানার কেউ হতে পারেন, এমনকি আহ্বায়ক কমিটির একজনও হতে পারেন।
এছাড়াও, আরও অনেক উপধারা ও নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করা যেতে পারে। তবে, এই ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কেউ যদি নিজেকে নিরাপদ মনে করে বসে থাকে, সে অবাস্তব আশায় বিভোর, এবং এটি খুব সম্ভবত আমরা সকলেই অনুভব করেছি।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রথমে প্রয়োজন আলোচনা, এবং সেই আলোচনা প্রতিটি পর্যায়ে শুরু করা যেতে পারে। যদি এটি শুরু করা যায়, তবে বাস্তবায়ন একদিন সম্ভব হবে, ইন শা আল্লাহ। ঈমানের নৈরাশ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে, আমরা আশাবাদী, যে একদিন বৈচিত্র্যময় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে, ইন শা আল্লাহ।

0 মন্তব্যসমূহ