Ticker

6/recent/ticker-posts

সমকালীন বিশ্বে ইসলাম প্রচারের কৌশল

 


মাওলানা জুনাইদ


সমকালীন বিশ্বে ইসলাম প্রচারের কৌশল

আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সহ  সকল নবী, রাসুল পাঠিয়েছেন দীনের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে। তাঁরা আমৃত্যু নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এই মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদায় হজের ভাষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি কি (দীনের দাওয়াহ) পৌঁছিয়েছি?’ সাহাবাগণ উত্তরে বলেন, ‘হ্যাঁ, (হে আল্লাহর রাসূল) আপনি যথাযথভাবে পৌঁছিয়েছেন।’ এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আঙ্গুল আসমানের দিকে তুলে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।’ অতঃপর তিনি বললেনঃ প্রত্যেক উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির কাছে (আমার দাওয়াত) পৌঁছিয়ে দেয়। কেননা, যাদের কাছে পৌঁছানো হবে তাদের মধ্যে অনেক ব্যক্তি এমন থাকে যে, শ্রবণকারীর চেয়ে অধিক সংরক্ষণকারী। [ সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন)সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন) হাদিস নং  ১৭৪১ ]

তখন থেকে এখন পর্যন্ত দাওয়াহর এই ধারাটি অব্যাহত রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকবে ইন-শা-আল্লাহ। প্রতিটি যুগের দাঈরা সেই যুগের ভাষা, কৌশল, পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইসলাম প্রচার করেছেন। ইসলাম এভাবেই আরব ভূখণ্ড থেকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আলোকিত করেছে জনপদ পর জনপদ। কিয়ামতের আগে এভাবেই ইসলাম প্রতিটি জনপদে পৌঁছে যাবে। হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী কিয়ামতের আগে এ জমিনের উপর এমন কোন মাটির অথবা পশমের ঘর (তাঁবু) বাকী থাকবে না, যে ঘরে আল্লাহ রব্বুল ’আলামীন ইসলামের বাণী পৌঁছিয়ে দিবেন না। সম্মানীর ঘরে সম্মানের সাথে আর লাঞ্ছিতের ঘরে লাঞ্ছনার সাথে তা পৌঁছাবেন। [ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) হাদিস নং ৪২ / সহীহ: আহমাদ ২৩৩০২ ]

সময়ের ভাষা আয়ত্ত করে এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দাওয়াহর কাজ করলে এই যুগেও ইসলাম প্রচারে সফলতা আসবে ইন-শা-আল্লাহ। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী, দাওয়াহর মাধ্যম, কৌশল ও পদ্ধতি কী হতে পারে, এই বিষয়টি নিয়েই এই নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। তথ্যপ্রযুক্তি পৃথিবীকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে এবং মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করেছে; এর মাধ্যমে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি একটি অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। এই বাস্তবতা মেনে, এর সফল ব্যবহার করে দাওয়াহর কাজ করলে অনেক সফলতা আসবে ইন-শা-আল্লাহ। এটি অস্বীকার করলে বা অবজ্ঞা করলে দাওয়াহ অনেক পিছিয়ে যাবে।

বিশ্বে সকল নতুন প্রযুক্তি আল্লাহর সৃষ্টির অংশ। আল্লাহ-সৃষ্ট পদার্থসমূহের সংযোগের মাধ্যমে মানুষ নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীতে সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। [ সূরাঃ আল-বাকারা আয়াতঃ ২৯ ]

যে জাতি যত বেশি শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার শিখেছে, সে জাতি তত বেশি বৈষয়িকভাবে উন্নত। ইসলাম মানুষের জন্য কল্যাণকর প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার অনুমোদন করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি যখন আয়াত নাযিল হয় ‘আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের ভীতি প্রদর্শন করুন’[ সূরাঃ আশ-শুআ'রা আয়াতঃ ২১৪ ], তখন তিনি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে  বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ধরে তাদেরকে ঈমানের দাওয়াহ দেন। পাহাড়ের উপর ওঠার কারণ ছিল যে, আওয়াজ বেশি দূর পর্যন্ত পৌঁছায়। এটি থেকে স্পষ্ট যে, দাওয়াহ পৌঁছানোর জন্য বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করা অনুমোদিত, বরং সুন্নাহর অংশ। রাসূল (সা.) সাধ্যমতো সে যুগের মাধ্যম ব্যবহার করেছিলেন। এখন, এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে, দাওয়াহর কাজে এর ব্যবহার সুন্নাহ বলে বিবেচিত হবে।

তবে প্রযুক্তির প্রতিটি উপকরণ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ভালো বা খারাপ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। প্রযুক্তির দ্বৈত ব্যবহার সবসময়ই হয়েছে। আমরা যারা দাওয়াতি কাজে নিয়োজিত, তারা এর ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের ও সমাজকে রক্ষা করতে পারি; বরং তাই করা উচিত। কারণ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুততার সঙ্গে অনেক মানুষের কাছে দাওয়াহ পৌঁছানো সম্ভব।

যেমনটি বলেছেন শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ), বর্তমান যুগে আমাদের দাওয়াতী কাজকে আল্লাহ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। এমন কিছু কৌশল আমরা অর্জন করেছি, যা পূর্বের যুগের দাঈগণ অর্জন করেননি। সাথে সাথে বিভিন্ন তথ্যাদি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে খুব সহজেই উপস্থাপন করতে পারি অথচ পূর্বের আলেমগণ এত সহজে তথ্য উপস্থাপন করেননি। [ ইবনু বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৩১ ]

প্রযুক্তি নিজে নিরপেক্ষ। এটি ভালো বা খারাপ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। খারাপ মানুষের হাতে প্রযুক্তি ক্ষতিকর হতে পারে, আবার ভালো মানুষের হাতে এটি মানুষের কল্যাণ সাধনে সহায়ক হতে পারে।

নিম্নে আমরা আধুনিক দাওয়াতের কিছু পদ্ধতি উপস্থাপন করব, যার মাধ্যমেও দাওয়াতী কাজ সহজভাবে করতে পারি। পূর্বেই বলেছি সব মানুষের চাহিদা বা স্বাদ এক ধরণের নয়, ভিন্ন চাহিদা বা স্বাদের মানুষ আছে। তাই যার কাছে যা গ্রহণযোগ্য মনে হয় তার কাছে তাই উপস্থাপন করা যেতে পারে।

ইন্টারনেটে দ্বীন প্রচার: 

নবী-রাসূলগণও দাওয়াতী কাজে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। মহান আল্লাহর বাণী, নূহ (আলাইহিস সালাম) বলেন, "আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবারাত্রি দাওয়াত দিয়েছি, অতঃপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়েছি, এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি" (সূরা আন-নূহ: ৫, ৮-৯)। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,"এ যমীনের উপরে এমন কোন মাটির অথবা পশমের ঘর বাকী থাকবে না, যেখানে ইসলামের বাণী আল্লাহ প্রবেশ করাবেন না। সম্মানীর ঘরে সম্মানের সাথে আর লাঞ্ছিতের ঘরে লাঞ্ছনার সাথে তা পৌঁছাবে। আল্লাহ যাদেরকে সম্মানিত করবেন তাদেরকে স্বেচ্ছায় ইসলাম কবুলের উপযুক্ত করে মর্যাদাবান ও গৌরবময় করে দিবেন। যারা ইসলাম গ্রহণ করবে না, আল্লাহ তাদের অপমানিত করবেন এবং তারা এ কালিমার প্রতি অনুগত হবার জন্য বাধ্য হবে।"

এটি এমন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে ইসলামের বাণী পৌঁছাবে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কিভাবে? ২০ বছর আগে হয়তো আমরা এই প্রশ্নের উত্তর সহজে দিতে পারিনি, তবে আজকের যুগে তার একটি দৃশ্যমান উত্তর পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার *‘সংকল্প’* কবিতায় বলেছেন, “বিশ্বটাকে দেখব আমি আপন হাতের মুঠোই পুরে।”                                            এখানে কবির কথা যেন আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগের অঙ্গীকারের মতোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইসলাম এবং দ্বীনের বাণী পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

ফেইসবুক:

বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হলো ফেসবুক, এটি তরুণদের আকর্ষণ কেন্দ্র। যা ১৪০টি ভাষায় লেখা এবং বক্তৃতা আপলোড করার সুযোগ প্রদান করে। এবং বর্তমানে প্রায় ২.৯৩ বিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারী ফেসবুকের সদস্য। সময় নষ্টের মেশিন হিসাবে পরিচিত’ চায়না, সিরিয়া, ইরানে ব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ থাকলেও যারা কিছু করতে চায় তাদের নিরাপদ এবং স্বাধীন ক্ষেত্র হল ফেসবুক।

যেখানে অন্যরা সময় নষ্ট করতে ব্যস্ত, সেখানে একজন দাঈ'র জন্য ফেসবুকে কোন মাসআলা, প্রবন্ধ, শিক্ষণীয় হাদীছ, বা সময়োপযোগী কোনো ক্লিপ শেয়ার করা, গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় বা সচেতনমূলক স্পট শেয়ার করা, ইসলামবিদ্বেষী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রচার করা, অথবা অনুভূতিতে নাড়া দেওয়া চলমান ঘটনা নিয়ে আলোচনা করাও দাওয়াতী কাজের অংশ হতে পারে।

ইউটিউব:

এই শতাব্দীর অন্যতম একটি যোগাযোগ মাধ্যম হলো ইউটিউব। ভিডিও কন্টেন্টের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর বাণী এবং ইসলামের বিধানগুলোর প্রচার করা সম্ভব। কিছু সময়ের মধ্যে খুব সহজে অনেক মানুষ ভিডিও দেখতে পারেন, যা বই পড়ার তুলনায় অনেক সহজ এবং দ্রুত। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দাওয়াহের কাজ করা যেতে পারে।

টেলিভিশন:

টেলিভিশন এখনো অনেক পরিবারে রয়েছে এবং এটি সামাজিক ও পারিবারিক বিনোদনের একটি প্রধান মাধ্যম। ইসলামের পরিবারব্যবস্থা, সন্তান লালন-পালন, আদব ও আখলাক ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করলে অনেক মানুষ ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবেন।

রেডিও:

বিশ্বের অনেক দেশে এখনো রেডিও সক্রিয় রয়েছে। গাড়িতে বা অন্যান্য স্থানে রেডিও শুনে মানুষ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দাওয়াহের কাজ করা যেতে পারে।

প্রিন্ট মিডিয়া:

এখনো অনেক মানুষ পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে থাকতে পছন্দ করে। পত্রপত্রিকা দিয়ে দাওয়াহর কাজ করা সম্ভব।

ওয়েব পত্রিকা:

এই আধুনিক যুগে ওয়েব পত্রিকাও দাওয়াহর জন্য একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এতে অনেক মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছানো সম্ভব।

মেইল ও টেক্সট মেসেজ:

চিঠিপত্রের মাধ্যমে দাওয়াহ প্রদান রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ ছিল। আজকের দিনে, মেইল ও টেক্সট মেসেজ এর আধুনিক সংস্করণ। এসব মাধ্যমে মানুষকে দাওয়াহ দেওয়া খুবই কার্যকর হতে পারে।

এই নিবন্ধে আমরা সমকালীন বিশ্বে ইসলাম প্রচারের বিভিন্ন মাধ্যমের কথা আলোচনা করেছি। এগুলো উদাহরণস্বরূপ, আরও অনেক মাধ্যম রয়েছে যার মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করা সম্ভব। তবে, যেকোনো মাধ্যম ব্যবহার করলেই, দাওয়াহর কাজ কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক হওয়া উচিত, এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা উচিত।

উল্লেখযোগ্য যে, যেকোনো দাঈকে তার সক্ষমতা ও পদ্ধতির মাধ্যমে কাজ করতে হবে। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে দাওয়াহর মূলনীতি জানার পরেই সফলতার দিকে এগোনো সম্ভব হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ