Ticker

6/recent/ticker-posts

ইসলামে তওবার গুরুত্ব: আল্লাহর কাছে পাপমুক্তি ও আত্মবিশুদ্ধির একমাত্র পথ


মাওলানা জুনাইদ

 ইসলামে তওবার গুরুত্ব: আল্লাহর কাছে পাপমুক্তি ও আত্মবিশুদ্ধির একমাত্র পথ

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা যা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে শান্তি এবং সঠিক পথ প্রদর্শন করে। আমাদের জীবনে নানা সময় বিভিন্ন ভুল এবং অপরাধ ঘটে থাকে। তবে আল্লাহ তাআলা তার অশেষ দয়ায় আমাদেরকে তাওবা করার সুযোগ প্রদান করেছেন। কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ সূরার নামকরণ করা হয়েছে সূরা তওবা। এছাড়া সূরা নুর,সূরা তাহরিম, সূরা বাকারা, সূরা ফুরকানসহ কুরআনের আরও অনেক স্থানে তওবা এবং এর গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।


আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:  وَ تُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰهِ جَمِیۡعًا اَیُّهَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

"আর তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।" (সূরাঃ আন-নূর আয়াতঃ ৩১)

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন: یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا تُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰهِ تَوۡبَۃً نَّصُوۡحًا ؕ عَسٰی رَبُّكُمۡ اَنۡ یُّكَفِّرَ عَنۡكُمۡ سَیِّاٰتِكُمۡ وَ یُدۡخِلَكُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُ ۙ یَ

হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ কর, বিশুদ্ধ তাওবাহ; সম্ভবতঃ তোমাদের রাব্ব তোমাদের মন্দ কাজগুলি মোচন করে দিবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত।  (সূরাঃ আত-তাহরীম আয়াতঃ ৮)


নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন যারা তাঁর কাছে তওবা করে, এবং তিনি তাদেরকে ভালবাসেন যারা নিজেদেরকে পবিত্র করে।  (সূরা আল-বাকারা আয়াত ২২২)

অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন, যারা ভূলবশত মন্দ কাজ করে, অতঃপর অনতিবিলম্বে তওবা করে, এরাই হল সেসব লোক যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন; আল্লাহ মহাজ্ঞানী রহস্যবিদ। আর এমন লোকদের জন্য কোন ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমনকি যখন মাথার উপর মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে - আমি এখন তওবা করছি। আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফুরি(অবাধ্য) অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি। (সূরা আন-নিসা আয়াত ১৭-১৮)

কুরআনের ন্যায়, হাদীসেও তওবার উল্লেখ রয়েছে এবং এর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। তিরমিযী গ্রন্থে একটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে: রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "প্রত্যেক আদম সন্তানই পাপ করে, পাপীদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম যারা তওবা করে।"/রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "প্রত্যেক আদম সন্তান ত্রুটিশীল ও অপরাধী, আর অপরাধীদের মধ্যে উত্তম লোক তারা যারা তওবা করে।" (আহমাদ ১৩০৪৯, তিরমিযী ২৪৯৯, ইবনে মাজাহ ৪২৫১, দারেমী ২৭২৭, বাইহাক্বী ৭১২৭)

তাওবা শুধুমাত্র মুখ দিয়ে শব্দ উচ্চারণের বিষয় নয়, বরং এটি একটি পরিশুদ্ধ মন ও হৃদয়ের পরিবর্তন। যখন কেউ তার পূর্ববর্তী পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং সৎ পথে ফিরে আসে, তখন আল্লাহ তার তাওবা গ্রহণ করেন। 


আল্লাহর রাসূল বলেন, "তোমাদের কেও মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট খুঁজে পেয়ে যতটা খুশি হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবাতে তাঁর চেয়েও বেশি খুশি হন।" (সহীহ বুখারী)

তবে তওবা হতে হবে শুধু আল্লাহর নিকট ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। যেকোনো মানুষই ভুল করতে পারে; শুধুমাত্র আল্লাহই ভুলের ঊর্ধ্বে। তাই মানুষকে ক্ষমা করার এখতিয়ার শুধুমাত্র আল্লাহই রয়েছে। ইসলামে মানুষের অন্যের অনুশোচনা শোনার ও তার ক্ষমা ঘোষণা দেয়ার বিষয়টি নিষিদ্ধ। অনুরুপ, আল্লাহ ব্যতীত অন্য করো নিকট তওবা চাওয়া নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ বলেন: اِنَّ الَّذِیۡنَ تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ عِبَادٌ اَمۡثَالُكُمۡ

আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাক তারা তোমাদের মত বান্দা। (সূরাঃ আল-আ'রাফ আয়াতঃ ১৯৪)


তওবার শর্ত

ইসলামী শরীয়ত মতে, বান্দা তওবা করলে আল্লাহ তা গ্রহণ করেন। অবশ্য সেটা হতে হবে আন্তরিক। আলেমগণ এ বিষয়ে একমত যে যদি কোনো ব্যক্তি তার কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত না হয় বা তা পরিত্যাগের ইচ্ছা না করে, তহলে তার মৌখিক তওবা উপহাস ছাড়া আর কিছু নয়। মৌখিক তওবা প্রকৃত তওবা নয়। আন্তরিক তওবার কিছু শর্ত রয়েছে। হযরত আলী (রা.) কে তওবা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন তওবা হল ছয়টি বিষয়ের সমষ্টি:


  1. নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

  2. অনাদায়ী ফরয/ওয়াজিব ইবাদতসমূহ আদায় করা।

  3. অন্যের সম্পত্তি/অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফেরত দেয়া।

  4. শারীরিক বা মৌখিকভাবে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চওয়া।

  5. ভবিষ্যতে পাপকাজ পরিত্যাগের দৃঢ় সংকল্প করা।

  6. আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করা।


ইসলামে তওবা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি একজন মুসলিমের আত্মবিশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তওবা ব্যক্তিকে তার পূর্ববর্তী ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সৎ পথে ফিরে আসার প্রেরণা দেয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে তার জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ তাআলা তার অশেষ দয়া ও করুণায় তওবার সুযোগ প্রদান করেছেন, যাতে বান্দারা তাদের পাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং জান্নাতের পথে পরিচালিত হতে পারে। তওবার মাধ্যমে একজন মুসলিম তার ঈমানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। অতএব, প্রত্যেক মুসলমানকে তওবাহ করার সুযোগ থেকে সদ্ব্যবহার করে নিজেদের জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথেই পরিচালিত করতে হবে।  আল্লাহ তাআলা আমাদের তৌফিক দান করুন (আমিন)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ