নতুন বছরের ক্যালেন্ডার উল্টানোর আগে কিছুক্ষণ ভাবুন
এক.
নতুন একটি বছর শুরু হওয়া মানে জীবনের একটি অমূল্য অংশ চলে যাওয়া। কবরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে যখন একটি নতুন বছর আসে, তখন উল্লাস আর আনন্দে বিভোর হওয়া, কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। জীবনকে প্রতিটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে মূল্যায়ন করা উচিত, যেমন একজন হিসাবি ব্যক্তি নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখে। এটাই স্বাভাবিক।
হজরত উমর (রা.) বলেছেন, তোমরা হিসাব গ্রহণের আগে নিজেই নিজের হিসাব নাও। (যুহদ, আহমদ বিন হাম্বল-৬৩৩)।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
তোমরা তাদের মতো হয়ে যেও না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, আর আল্লাহও তাদের আত্মভোলা করে দিয়েছে। (সূরা হাশর, আয়াত ১৯)
সুনান তিরমিযীতে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে,
প্রকৃত বুদ্ধিমান সে, যে নিজের হিসাব গ্রহণ করে এবং পরকালের জন্য কাজ করে। (তিরমিযী, ২৪৫৯)
আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত বান্দাদের সম্পর্কে বলেন,
নিশ্চয়ই যারা তাদের প্রতিপালকের ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকে, তারা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করে এবং তাতে অগ্রগামী হয়। (সূরা মুমিনূন, আয়াত ৫৭, ৬১)
নতুন বছর এলেই কি আনন্দ-ফূর্তি করতে হবে? সব নতুনত্বের মধ্যে উৎসব ও উন্মাদনায় ডুবে যাওয়ার প্রবণতা উম্মাদের কাজ হতে পারে। যদি মনে করেন যে একটি নতুন বছর উদযাপন আপনার জন্য আনন্দের কারণ, তাহলে মনে রাখুন—একটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর জন্য নতুন বছরের আগমন কোনো উৎসবের কারণ হতে পারে না। বরং প্রতিটি নতুন দিন তাকে তার নিঃশ্বাসের সময় বাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের সবার জীবন তো এক প্রকার মৃত্যুদণ্ডের মতোই, যেহেতু জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমাদের মৃত্যুর দিনটি নির্ধারিত। যে কোনো মুহূর্তে সেটি চলে আসতে পারে!
আল্লাহ তাআলা বলেন,
প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
দুই.
নতুন বছরের প্রথম দিনকে উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন একটি পুরোনো ইতিহাস বহন করে। ইরানের অগ্নিপূজকরা এই দিনটি 'নওরোজ' (নতুন দিন) নামে পরিচিতি দিয়েছিলেন এবং এটি তারা উপাসনা ও আনন্দে কাটাতেন। হাজার বছর ধরে এই রীতি পালন হয়ে আসছে। কয়েক শতাব্দী পূর্বে খ্রিস্টানরাও তাদের খ্রিস্টীয় নববর্ষ উদযাপন করত।
বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের (অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানদের) আচরণ অনুসরণ করবে। এমনকি তারা যদি কোনো গর্তে প্রবেশ করে, তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে। (বুখারি: ৩২৬৯, মুসলিম: ২৬৬৯)
সুনান আবু দাউদে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (আবু দাউদ: ৪০৩১)
তিন.
ইংরেজি নববর্ষ বরণ উপলক্ষে বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশে কোটি কোটি টাকা অপব্যয় করে আতশবাজি পোড়ানো হয়। সমাজের বড় একটি অংশ উৎসবের নামে পশুত্বের সীমা অতিক্রম করে অশ্লীলতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। যখন লজ্জা চলে যায়, তখন আর কোনো বাঁধা থাকে না। অর্থনৈতিক সংকট এবং দারিদ্র্যের মধ্যেও, যারা সাধারণ মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার কথা, তারাই আবার থার্টি ফার্স্ট নাইটের অশ্লীলতায় মেতে ওঠে। নারীর অধিকার আদায়ের নামে ইসলামকে আক্রমণ করা নারীবাদীরা আবার নারীকেই পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে এই রাতে। বাংলা সংস্কৃতির ‘ধ্বজাধারী’ সংস্কৃতিপ্রেমীরা পশ্চিমা এই সংস্কৃতিতে ডুবে যান।
এমন একটি দেশে, যেখানে কনকনে শীতে এক টুকরো কাপড়ের অভাবে বহু মানুষ চরম কষ্টে পড়ে, সেখানে প্রতি বছর থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে দেশের বাইরে থেকে ডিজেরা আসেন, পাঁচতারকা হোটেলে তাদের নাচ ও গানের অনুষ্ঠানে মেতে ওঠেন। সেখানে থাকে অশ্লীল নাচ, ফ্যাশন শো, আইটেম ড্যান্স, এবং লাইভ মিউজিক কনসার্ট।
চার.
আমরা মুখে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বললেও, বাস্তবে আমাদের জীবন কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের হাতের পুতুল হয়ে উঠেছে। তারা আমাদের জন্য নানা দিবস ও সংস্কৃতি ডিজাইন করে, যাতে তাদের ব্যবসা সফল হয়।
প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে, মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শক্তি—এমনকি আমাদের নিজের প্রবৃত্তির দাসত্বও ত্যাগ করতে হবে। অন্যথায়, আমরা আজীবন স্বাধীনতার খোলসের মধ্যে পরাধীন হয়ে থাকব। মহান আল্লাহ আমাদের শুদ্ধ চিন্তা এবং সঠিক কাজ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

0 মন্তব্যসমূহ