Ticker

6/recent/ticker-posts

ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা, মাতৃভাষা ও বিশুদ্ধ ভাষা চর্চার গুরুত্ব

 


ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা, মাতৃভাষা ও বিশুদ্ধ ভাষা চর্চার গুরুত্ব.


মাওলানা জুনাইদ

ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা, মাতৃভাষা ও বিশুদ্ধ ভাষা চর্চার গুরুত্ব


ইসলাম ভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও গুরুত্ব প্রদান করেছে। ভাষা মানুষের চিন্তা, অনুভুতি এবং মতামত প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম। মাতৃভাষার মাধ্যমে মানুষ তার নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচিতি বজায় রাখে, যা ইসলামের শিক্ষা ও সামাজিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে। 


মহান আল্লাহ পাক কুরআনুল কারীমে বলেছেন,

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنَّا خَلَقۡنٰكُمۡ مِّنۡ ذَكَرٍ وَّ اُنۡثٰی وَ جَعَلۡنٰكُمۡ شُعُوۡبًا وَّ قَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوۡا ؕ اِنَّ اَكۡرَمَكُمۡ عِنۡدَ اللّٰهِ اَتۡقٰكُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ

অর্থ   >  হে মানুষ! তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মানীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন।[সূরাঃ আল-হুজুরাত আয়াত নং ১৩]         

অর্থাৎ তিনি পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি ও ভাষা সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। এই আয়াতটি ভাষার বৈচিত্র্য ও গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।


ইসলামে ভাষার বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং অশুদ্ধ বা বিকৃত ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকার উপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসের ভাষা আরবি, যা অত্যন্ত সঠিকভাবে এবং শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা আবশ্যক। এটি কেবল ধর্মীয় বিষয়ে নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।


মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইসলাম শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তার শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করেছে। এর মাধ্যমে কেবল ধর্মীয় জ্ঞান নয়, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা গ্রহণও সহজ হয়। 


অতএব, ইসলাম ভাষার শুদ্ধতা, মাতৃভাষার ব্যবহার এবং ভাষার যথার্থ প্রয়োগের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও সুন্দর, অর্থপূর্ণ ও নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করে।


ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব

মানুষ যে ভাষায় সবচেয়ে বেশি দক্ষ, যেটি সে তার পিতা-মাতা বা অভিভাবকদের কাছ থেকে ছোটবেলা থেকে শিখে, সেটিই সাধারণত মাতৃভাষা হিসেবে পরিচিত। ইসলাম মাতৃভাষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষা ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে সফলতার জন্য মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য। আল্লাহ প্রতিটি নবীকে তার দাওয়াতি এলাকার ভাষায় পাঠিয়েছেন। 

আল্লাহ কুরআনে বলেছেন:  

وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ رَّسُوۡلٍ اِلَّا بِلِسَانِ قَوۡمِهٖ لِیُبَیِّنَ لَهُمۡ ؕ فَیُضِلُّ اللّٰهُ مَنۡ یَّشَآءُ وَ یَهۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَكِیۡمُ

অর্থাৎ : আমি কোন রসূলকেই তার জাতির ভাষা ছাড়া পাঠাইনি যাতে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে (আমার নির্দেশগুলো) বর্ণনা করতে পারে। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছে পথহারা করেছেন, আর যাকে ইচ্ছে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, তিনি বড়ই পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়।(সুরা ইবরাহীম: ৪)


আমাদের নবী সা. শারীরিকভাবে আরবদের মধ্যে আবির্ভূত হলেও, তিনি কেয়ামত পর্যন্ত সমস্ত জাতির নবী। কিন্তু যেহেতু তার প্রথম দাওয়াতি অঞ্চল ছিল আরব, তাই কুরআনের ভাষা আরবি। আল্লাহ তাকে আরবি ভাষায় অসামান্য দক্ষতা প্রদান করেছিলেন। নবী সা. নিজেই বলেছেন, "আমি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাষাভাষী।" এমনকি কুরআন প্রথমদিকে আরবি ভাষার সাতটি আঞ্চলিক উপভাষায় নাযিল হয়েছিল, যাতে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ কুরআনের মর্ম বুঝতে পারে।


একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, নবী মুসা আ. কে যখন ফেরাউনের কাছে পাঠানো হন, তার জিহ্বায় জড়তা ছিল। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, "হে আমার প্রতিপালক, আমার বক্ষ প্রশস্ত কর, আমার কাজ সহজ কর, আমার জিহ্বার জড়তা দূর কর, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।" (সুরা ত্বা: ২৫–৩৬)


ভাষা আল্লাহর নিয়ামত

ভাষা শুধু আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামতও বটে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ভাষা শিখিয়েছেন এবং এটি তার অনুগ্রহের একটি নিদর্শন।  

আল্লাহ তাআলাবলেন:  

وَ لِسَانًا وَّ شَفَتَیۡنِ ۙ

অর্থ:  আর তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন জিহ্বা ও ঠোঁট, যার মাধ্যমে তোমরা কথা বলতে পারো, মনের ভাব প্রকাশ করতে পারো। (সুরা বালাদ: ৯)


ভাষার কুসংস্কার

আমাদের সমাজে ভাষা সম্পর্কেও কিছু কুসংস্কার রয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে, কিছু ভাষা উত্তম, আবার কিছু ভাষা অধম। উদাহরণস্বরূপ, কেউ বলে ইংরেজি খ্রিষ্টানদের ভাষা, বাংলা হিন্দুদের ভাষা এবং আরবি মুসলমানদের ভাষা। তবে, ভাষার কোনো ধর্ম নেই। ইসলামকে জানার জন্য আরবি ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটি অন্যান্য ভাষার প্রতি অবহেলা করার কারণ নয়। ইসলামের উদ্দেশ্য ভাষার নয়, বরং তাকওয়ার ভিত্তিতে মানুষ আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠ। 

আল্লাহ বলেছেন,                  

                            اِنَّ اَكۡرَمَكُمۡ عِنۡدَ اللّٰهِ اَتۡقٰكُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ

অর্থ :  তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে অধিক তাকওয়াশীল। (সুরা হুজরাত: ১৩)


ইসলামে তিনটি ভাষার গুরুত্ব

এই সময়ে সচেতন মুসলমানদের জন্য বিশেষত দাঈদের জন্য তিনটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:


১. বাংলা: দেশের অভ্যন্তরে দাওয়াতি কাজের জন্য বাংলা ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. আরবি: কুরআন-হাদীসের মূল উৎস হতে জ্ঞান লাভ করতে হলে আরবি ভাষার দক্ষতা প্রয়োজন।

৩. ইংরেজি: আন্তর্জাতিক পরিসরে দাওয়াত, যোগাযোগ এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা থাকা আবশ্যক।


এই তিনটি ভাষা শুধু দীন শিক্ষা নয়, পৃথিবীজীবনে উপকৃত হওয়ার জন্যও অত্যন্ত সহায়ক।


ভাষারক্ষায় আত্মত্যাগকারীদের জন্য আমাদের করণীয়

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা রক্ষায় যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মরণ করা আমাদের কর্তব্য। তাদের অবদানকে স্বীকার করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা আমাদের দায়িত্ব। 

রসুল সা. বলেছেন:  "যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।" (আবু দাউদ)


মাতৃভাষা দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা

মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিজ্ঞা থাকা উচিত:

১. বিশুদ্ধ মাতৃভাষার চর্চা: আমরা চেষ্টা করব সুন্দর ও বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলতে। 

২. বাংলাভাষা আমাদের সংস্কৃতির অংশ: আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা জানাবো এবং তা সংরক্ষণ করব।

৩. ভাষাপ্রেম হৃদয়ে ধারণ: মাতৃভাষা উদযাপনে শুধু বাহ্যিক দেখন-ধড়ন নয়, বরং হৃদয়ে ভাষাপ্রেম থাকতে হবে।

৪. ভাষা গালিমুক্ত রাখা: মাতৃভাষাকে গালির আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখার জন্য সচেতন থাকতে হবে।


সমাপ্তি.

আল্লাহ আমাদেরকে মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন এবং যাদের মাধ্যমে আমরা মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা পেয়েছি, তাদের মর্যাদাকে সম্মানিত করুন। আমিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ