মাওলানা জুনাইদ
মানবিক ও সুস্থ ধারার সমাজ গঠনে মসজিদের ভূমিকা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
মুসলিম সভ্যতার মূলে রয়েছে মসজিদ। মসজিদ ছাড়া মুসলিম সমাজ কল্পনাও করা যায় না। এটি ইসলামের অন্যতম প্রধান নিদর্শন এবং ইসলামের শিআর (রীতিনীতির) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো অঞ্চলে মসজিদ থাকলে তার মানে হলো সেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি রয়েছে। মসজিদকে ইসলামী সমাজের হৃদপিণ্ড বলা হয়, কারণ এটি শুধু নামাজের স্থান নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। আল্লাহ তাআলা মসজিদকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
اِنَّ اَوَّلَ بَیۡتٍ وُّضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِیۡ بِبَكَّۃَ مُبٰرَكًا وَّ هُدًی لِّلۡعٰلَمِیۡنَ
নিশ্চয়ই সর্ব প্রথম গৃহ, যা মানবমন্ডলীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে তা ঐ ঘর যা বাক্কায় (মাক্কায়) অবিস্থত; ওটি সৌভাগ্যযুক্ত এবং সমস্ত বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শক। (আলে ইমরান, ৯৬)
মদিনায় হিজরতের পর, নবী করিম (সা.) সব ধর্মীয়, সামাজিক, এবং রাষ্ট্রীয় কাজ মসজিদ থেকে পরিচালনা করতেন। পরবর্তী খলিফারা এই ধারাকে অনুসরণ করেছেন।
ইসলামের প্রথম যুগের মসজিদগুলো শুধু নামাজের জায়গা ছিল না; সেগুলো ছিল পরামর্শগৃহ, আদালত, শিক্ষা কেন্দ্র, এবং দরিদ্রদের আশ্রয়স্থল। রাসূল (সা.)'র মসজিদ ছিল পুরো সমাজের কেন্দ্র, যেখানে আধ্যাত্মিক, সামাজিক, এবং মানবিক কার্যক্রম আবর্তিত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান যুগে, বিশেষত বাংলাদেশে, মসজিদ শুধু নামাজের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ভূমিকা দীনি শিক্ষা, সমাজিক উন্নয়ন, এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে একেবারেই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
মসজিদের গুরুত্ব ইসলামে:
মসজিদ ইসলামের প্রথম এবং প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
اِنَّ اَوَّلَ بَیۡتٍ وُّضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِیۡ بِبَكَّۃَ مُبٰرَكًا وَّ هُدًی لِّلۡعٰلَمِیۡنَ
নিশ্চয়ই সর্ব প্রথম গৃহ, যা মানবমন্ডলীর জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে তা ঐ ঘর যা বাক্কায় (মাক্কায়) অবিস্থত; ওটি সৌভাগ্যযুক্ত এবং সমস্ত বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শক। (আলে ইমরান, ৯৬)
রাসূল (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর কুবা পল্লীতে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে মদিনা শহরের কেন্দ্রস্থলে মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) শুধু নির্দেশ দেননি, তিনি নিজেও সাহাবিদের সঙ্গে কাজ করে মসজিদ নির্মাণের জন্য ইট তৈরি করেছেন এবং তা বহন করেছেন। মসজিদ নির্মাণের প্রতি তার আগ্রহ এবং গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
রাসূল (সা.) বলেছেন,
مَنْ بَنَى مَسْجِدًا وَجْهَ اللهِ بَنَى اللهُ لَهُ مِثْلَهُ فِي الْجَنَّةِ
উবাইদুল্লাহ খাওলানী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি উসমান ইবনু আফ্ফান (রাযি.)-কে বলতে শুনেছেন, তিনি যখন মসজিদে নাববী নির্মাণ করেছিলেন তখন লোকজনের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বলেছিলেনঃ তোমরা আমার উপর অনেক বাড়াবাড়ি করছ অথচ আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে মাসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্যে জান্নাতে অনুরূপ ঘর তৈরি করে দেবেন। (বুখারি, হাদীস নং ৪৫০; মুসলিম, হাদীস নং ৫৩৩)
এছাড়া তিনি বলেছেন,যেদিন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর ছায়ায় আশ্রয় পাবে। এর মধ্যে একটি শ্রেণি হলো, যারা সব সময় মসজিদের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
রাসুল সাঃ এর হাদিস :
আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে দিন আল্লাহর (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. সে যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে তার প্রতিপালকের ইবাদতের মধ্যে, ৩. সে ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে, ৪. সে দু’ ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালবাসে আল্লাহর ওয়াস্তে, একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য, ৫. সে ব্যক্তি যাকে কোনো উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহবান জানায়, কিন্তু সে এ বলে প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’, ৬. সে ব্যক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে বাম হাত তা জানে না, ৭. সে ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকর করে, ফলে তার দু’ চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০৩১; সহীহ বুখারি, হাদীস নং ৬৬০)
আদর্শ সমাজ গঠনে মসজিদের ভূমিকা:
মসজিদ আদর্শ ও মানবিক সমাজ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নবী (সা.)-এর যুগের মসজিদে নববী থেকে আমরা এর উত্তম উদাহরণ পাই। মসজিদ ছিল ধর্মীয়, সামাজিক, আর্থিক এবং রাষ্ট্রীয় কাজের কেন্দ্র। মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা তৈরি করে রাসূল (সা.) একসময় ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষদের একক সমাজে পরিণত করেছিলেন।
একত্ববাদের চেতনা:
মসজিদ তাওহিদের প্রতীক, যেখানে এক আল্লাহর ইবাদত করা হয়। রাসূল (সা.) এবং পরবর্তী ইমামগণ মসজিদের মাধ্যমে একত্ববাদ প্রচার করেছেন, যাতে শিরক ও বহুত্ববাদ দূর হয়ে যায় এবং সমাজ তাওহিদে মগ্ন হয়।
ভ্রাতৃত্ববোধ:
ইসলাম মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব এবং সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় জোর দিয়েছে। মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা মুসলমানদের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিরা একত্রিত হন, ফলে জাতি ও শ্রেণীভেদ দূর হয়ে যায় এবং পারস্পরিক সম্পর্ক শক্তিশালী হয়।
নেতৃত্ব ও আনুগত্য:
মসজিদে নামাজের ইমাম সমাজের নেতৃত্বের প্রতীক। ইমাম যখন নামাজের নেতৃত্ব দেন, তখন মুসল্লির মধ্যে আনুগত্যের বোধ সৃষ্টি হয়। এটি পরবর্তীতে সমাজে শৃঙ্খলা এবং দিকনির্দেশনার ভূমিকা পালন করে।
জ্ঞানচর্চা:
মসজিদ ছিল ইসলামি শিক্ষার কেন্দ্র। নবী (সা.)-এর যুগে মসজিদে নববীতে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা চলত, যেখানে সাহাবিরা কুরআন ও হাদীস চর্চা করতেন। মসজিদকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার ফলে সমাজে ইসলামী জ্ঞান বাড়ে এবং মানুষকে সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করা যায়।
পরিবার-ভিত্তিক সমাধান:
পারিবারিক সমস্যা সমাধানে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। রাসূল (সা.) মসজিদে বসে পরিবার সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান দিতেন। মসজিদে এমন ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে সমস্যা সমাধানে দম্পতিদের কাউন্সেলিং করা হয়।
পরামর্শ ও বিচার ব্যবস্থা:
মসজিদ ছিল পরামর্শ এবং বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জায়গা। মসজিদে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পরামর্শ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সমাজে আইনি সঠিকতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে মসজিদভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনৈতিক দায়িত্ব:
মসজিদ শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করে। রাসূল (সা.) মসজিদে যাকাত ও দানের মাধ্যমে দরিদ্রদের সহায়তা করতেন। বর্তমান সমাজেও মসজিদ কর্তৃপক্ষ যদি যাকাত এবং অন্যান্য সাহায্য প্রদান করে, তবে এটি সমাজের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত করতে সাহায্য করবে।
উপসংহার:
মসজিদ ইসলামী সমাজের কেন্দ্র। এটি শুধুমাত্র নামাজের স্থান নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজব্যবস্থার ভিত্তি। রাসূল (সা.) আমাদের জন্য এই প্রতিষ্ঠান রেখে গেছেন, এবং আমাদের দায়িত্ব হলো এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং সমাজে এর গুরুত্ব ও ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করা। মসজিদভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করে আমরা এক শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়তে পারি, যেখানে ন্যায়, সমতা, এবং ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে সবাই একত্রিত হতে পারবে।
পরবর্তী লেখার বিষয়: মসজিদভিত্তিক সমাজ গঠনে ইসলামিক ক্লাবের পরিকল্পনা

0 মন্তব্যসমূহ