mawlana zunaid
কেন থার্টি ফার্স্ট নাইট বর্জন করব
আল্লাহর দেয়া জীবন ও সময়ের মূল্য এবং থার্টি ফার্স্ট নাইটের বিপদ
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে জীবন দিয়েছেন, তা অত্যন্ত মূল্যবান। জীবন যতই মূল্যবান, তার ব্যবহারও ততই গুরুত্বপূর্ণ। এই মূল্যবান জীবনের সময়গুলোকে অবহেলায় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আল্লাহ তাআলার দেয়া জীবন ও সময় তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ব্যয় করার নির্দেশনা আমাদের শরীয়তের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা আমাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করছি এমন সব উৎসবে, যার মধ্যে নেই দুনিয়ার কল্যাণ এবং পরকালের মুক্তি। এমন একটি অনর্থক উৎসবের নাম হলো থার্টি ফার্স্ট নাইট। খ্রিষ্টীয় বছরের শেষ রাতটি বিভিন্ন দেশে আনন্দ-উৎসবে পরিণত হয়, যা সময়ের সাথে সাথে আমাদের দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আজ আমরা থার্টি ফার্স্ট নাইটের ইতিহাস, এর অপকারিতা এবং আমাদের করণীয় বিষয়ে আলোচনা করব।
থার্টি ফার্স্ট নাইটের ইতিহাস
প্রাচীনকাল থেকে ইরানের প্রকৃতিপূজারীরা বিশ্বাস করতেন যে, বছরের প্রথম দিন আনন্দে কাটালে সারা বছর সুখী হওয়া যাবে। এই বিশ্বাস থেকে তারা বছরের শুরুতে নানা উৎসব পালন করত। পরে এই ধারণা খ্রিষ্টানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, এবং তারা ৩১ ডিসেম্বর রাতটিকে উৎসবের রাত হিসেবে পালন করতে শুরু করে। পাশ্চাত্যের অনেক দেশে এই দিনটি 'সিলভেস্টারের দিবস' নামে পরিচিত। খ্রিষ্টানরা এই রাতে নাচ-গান, আনন্দ-ফূর্তি, মদ্যপান এবং আতশবাজি ফোটানোর মাধ্যমে নববর্ষকে স্বাগত জানায়, কিছু কিছু খ্রিষ্টান বিশেষ প্রার্থনা-অনুষ্ঠানে যোগ দেন। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রচারণার মাধ্যমে এই উৎসব আজ আমাদের সমাজেও এক ধরনের প্রচলন লাভ করেছে।
থার্টি ফার্স্ট নাইটের মূল ইতিহাস থেকে আমরা জানি, এটি এক ধরনের প্রকৃতিপূজা এবং কুসংস্কারের সাথে সম্পর্কিত। 'বছরের প্রথম দিন আনন্দে কাটলে সারা বছর সুখী হওয়া যাবে'—এটি একটি হাস্যকর কুসংস্কার। অথচ আজ যারা এই উৎসব উদযাপন করছেন, তাদের অনেকেই নিজেদের বিজ্ঞানমনস্ক বলে দাবি করেন এবং ইসলামকে কুসংস্কার মনে করেন। কিন্তু, তারা নিজেরাই এমন কুসংস্কারে নিমজ্জিত, যা অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।
থার্টি ফার্স্ট নাইট সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
কোনো উৎসব বা আচার-অনুষ্ঠান যদি ইবাদত হতে হয়, তাহলে তা কুরআন-হাদীসের দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত হতে হবে। কিন্তু, থার্টি ফার্স্ট নাইটের সঙ্গে কোনো ইসলামী দলিল নেই। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, এটি একটি ইবাদত নয়।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন—সবকিছু তো ইবাদত নয়, কিছু কাজ সামাজিকও হতে পারে। কথা সত্য, তবে যখন আমরা কোনো কাজ করি, তা যেন শরীয়তের বিধান অনুযায়ী হয়, এবং অন্যের হক নষ্ট না হয়। কিন্তু থার্টি ফার্স্ট নাইটের মধ্যে এই দুই শর্তই লঙ্ঘিত হচ্ছে।
প্রথমত, এই উৎসব প্রকৃতিপূজা এবং কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে, যা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দ্বিতীয়ত, এই উৎসবের মাধ্যমে মানুষের হক নষ্ট করা হচ্ছে, যা ইসলাম ও মানবিকতার বিরোধী।
থার্টি ফার্স্ট নাইটের সামাজিক ক্ষতি
থার্টি ফার্স্ট নাইটের উদযাপনের কোনো ইতিবাচক দিক নেই, বরং এর রয়েছে নানা নেতিবাচক প্রভাব যা আমাদের সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
১. অপচয়: এই উৎসবে অর্থের অপচয় হয়। ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি ফোটানো, সাউন্ডবক্স বাজানো, মদ্যপান—এসবের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, অথচ সেই অর্থে গরিবের জন্য কিছুই করা হয় না। আল্লাহ কুরআনে অপচয়কারীদের শয়তানের ভাই বলেছেন, এবং কোনো বিবেকবান মানুষ কখনো শয়তানের ভাই হতে চাইবে না।
২. স্বাস্থ্যবিপর্যয়: ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সাউন্ডবক্স এবং আতশবাজির বিকট শব্দ অনেকের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষত বৃদ্ধ, শিশু এবং অসুস্থ মানুষদের জন্য এটি মারাত্মক হতে পারে।
৩. প্রকৃতির ক্ষতি: আতশবাজি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং পাখিদের জীবন বিপন্ন করে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় বছরের প্রথম দিনের ভোরে আতশবাজির কারণে পাখির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
৪. নিরাপত্তার ঝুঁকি: ফানুসের আগুনে দুর্ঘটনা ঘটে, যা মানবসম্পদের ক্ষতি করতে পারে। ২০২২ সালে এমন একটি দুর্ঘটনায় এক দরিদ্র নারীর প্লাস্টিক কারখানা পুড়ে যায়, এবং একই বছর আতশবাজির কারণে একটি শিশুর মৃত্যু ঘটে।
৫. ভোগবাদী সমাজের উত্থান: থার্টি ফার্স্ট নাইট আমাদের সমাজে ভোগবাদী মনোভাবকে উৎসাহিত করছে, যা ইসলামের নীতি ও শিক্ষার বিপরীত। ইসলামে আনন্দের সাথে ত্যাগেরও গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা শুধুমাত্র ভোগবাদী মনোভাবকেই তুলে ধরছি।
থার্টি ফার্স্ট নাইট কেন বর্জন করা উচিত?
১. এটি মুসলিম সংস্কৃতি নয়: থার্টি ফার্স্ট নাইট মূলত অগ্নিপূজকদের সংস্কৃতির অংশ, এবং এর সাথে শিরকি বিশ্বাস জড়িত। ইসলামে এমন কোনো উৎসবের অনুমোদন নেই।
২. ইসলাম আমাদের পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি দিয়েছে: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ইসলামি সংস্কৃতির অংশ। আমাদের নিজেদের উৎসব থাকতে কেন আমরা অন্যের সংস্কৃতি গ্রহণ করব? ইসলামী সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমাদের নিজেদের পথ অনুসরণ করা উচিত।
৩. ভোগবাদিতার উৎসাহ: থার্টি ফার্স্ট নাইট ভোগবাদিতাকে উৎসাহিত করে, যা ইসলামের পরিপন্থী। ইসলাম আমাদের আত্মিক উন্নতির দিকে নির্দেশনা দেয়, শারীরিক আনন্দের পাশাপাশি আত্মিক শান্তিরও প্রয়োজন রয়েছে।
নতুন বছরের আহ্বান
নতুন বছর মানে নতুনের আগমন, কিন্তু তা আমাদের পুরাতন জীবনের বিদায়েরও প্রতীক। আমরা যখন বছরের প্রথম দিনটি উদযাপন করি, তখন কি কখনো মনে করি, আমাদের জীবনের পাতা আরও একটি বছর পেছনে চলে গেল? মৃত্যুর দিকে আরও একধাপ এগিয়ে গেলাম? থার্টি ফার্স্ট নাইটের আনন্দে আমরা কি একবারও ভাবি, কবরের দিকে আমাদের পা এগিয়ে চলেছে?
নতুন বছরের আহ্বান হোক, আত্মার উন্নতির এবং ভালো কাজের দিকে। পুরনো ভুলগুলো শোধরানোর এবং নতুনত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামী সংস্কৃতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন।

0 মন্তব্যসমূহ